
নারীর স্তনের আকার পুরুষ স্পর্শ কিংবা সঙ্গের উপর নির্ভর করে? কিশোর বয়স হতেই বাঙালী পুরুষদের মনস্তত্বে এই প্রশ্নের এক ভুল উত্তর যেনো গেঁথে যায়। তাদের চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটে কিছুটা এমন মন্তব্যে- “সবই হাতের জাদু” কিংবা “কে বানিয়েছে এমন?” এই চিন্তাভাবনা যে কতটা অবৈজ্ঞানিক এবং হীন মানসিকতার সেটাই আজকে আমরা আলোচনা করবো।
স্তনের আকার আকৃতি প্রধানত নির্ভর করে বংশপরম্পরায় পাওয়া জিনের উপরে। কোনো নারীর নিকটাত্মীয়ের (যেমন: মা, বোন, মাতামহ প্রভৃতি) স্তনের আকার তুলনামূলক বড় কিংবা ছোট হলে উক্ত নারীর ক্ষেত্রেও একইরকম আকারপ্রাপ্তির সম্ভাবনা সর্বাধিক। কোনো গোষ্ঠীর ৫৬ শতাংশ নারীর স্তনই তার পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যের মতো একই গড়নের হয়ে থাকে অর্থাৎ জিন এখানে বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে। বেশ কিছু জিনের ভূমিকা উল্লেখ করলাম, আগ্রহ থাকলে জেনে নিতে পারেন।
- ZNF703 (স্তনের টিস্যুর পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী। মূলত টিস্যুর পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য স্তন সুগঠিত হয়ে থাকে। এই জিন আবার অতি সক্রিয় হলে স্তন ক্যান্সার হতে পারে।)
- PPARG (স্তনের টিস্যুতে থাকা ফ্যাটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এই জিন যা সরাসরি স্তনের আকারকেও প্রভাবিত করে।)
- ESR1 (কোষ কিভাবে ইস্ট্রোজেন হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হবে তা এই জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ স্তনের এপিথেলিয়াল কোষের বৃদ্ধি ও বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে এই জিন।)
- IGF1 (এই জিন স্তনের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য টিস্যুর গঠনের উপরও প্রভাব ফেলে।)
- CYP19A1 (এই জিন এন্ড্রোজেন হরমোনকে ইস্ট্রোজেন হরমোনে রূপান্তরিত করে।)
এবার আসি হরমোনের কথায়। একটু আগেই আমরা ESR1 এবং CYP19A1 জিনের কথা আলাপ করেছি যারা ইস্ট্রোজেন হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে। এই ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টোরন, প্রোল্যাকটিন হরমোন সরাসরি স্তনবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বয়ঃসন্ধিকাল তথা পিউবার্টি শুরু হয় হাইপোথ্যালামাস হতে আগত সংকেতের কারণে। এই সংকেত পিটুইটারি নালিকাকে উত্তেজিত করে যার ফলে পিউবার্টি সম্পর্কিত হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়। এর মধ্যে- ইস্ট্রোজেন হরমোন স্তনের দুগ্ধগ্রন্থির গঠন উন্নত করে, যেখানে গ্রোথ হরমোনের কাজ স্তনের বাহ্যিক অংশ সুগঠিত করা।
ঋতুস্রাব চক্রের প্রথমার্ধে ইস্ট্রোজেন হরমোনের নিঃসরণ অনেক বেড়ে যায়, যার ফলে স্তনে থাকা দুগ্ধনালিকার বৃদ্ধি আরও দ্রুত ঘটে। শেষার্ধে প্রজেস্টেরন হরমোনের নিঃসরণ স্তনের গ্লান্ডুলার টিস্যুর বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। এই গ্লান্ডুলার টিস্যু একধরনের নিঃসরক টিস্যু যা দুগ্ধ তৈরীর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এসময়ে অনেক নারীই নিজের স্তনকে ভারী এবং অধিক স্ফীত অনুভব করে যা ঋতুস্রাব চক্রের শেষে আবার পূর্বের অবস্থায় চলে আসে। এছাড়া ইনসুলিন হরমোনের নিঃসরণ অধিক হলে তা স্তনের আকার বড় করে।
গর্ভধারণের পর নারীর স্তন ল্যাকটেশন তথা দুগ্ধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়। এসময় অমরা হতে নির্গত ইস্ট্রোজেন হরমোন স্তনে রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধি করে যার দরুন স্তন পূর্বের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সুগঠিত হয়। অমরা হতে ইস্ট্রোজেনের পাশাপাশি প্রোজেস্টেরনও নিঃসরিত হয়, যা দুগ্ধনিঃসরক অ্যালভিওলাই সুগঠিত করে। উল্লেখ্য, এই ইস্ট্রোজেন-প্রোজেস্টেরন হরমোন যুগলই শিশুপ্রসবের পূর্ব পর্যন্ত দুগ্ধ নিঃসরণ প্রতিরোধ করে প্রোল্যাকটিন হরমোনকে নিস্ক্রিয় রেখে।
অমরা হতে hPL নামক বিশেষ এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। এর নাম আমরা আগে শুনিনি। এই হরমোনও বাকিদের মতো স্তনবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে দুগ্ধগ্রন্থিকে দুগ্ধনিঃসরণ উপযোগী করে তোলে। পাশাপাশি ফ্যাট ঠিকমতো জমা হওয়া না হওয়ার পিছনেও ভূমিকা রয়েছে hPL এর।
আমরা ইতোমধ্যে এইটুকু বুঝতে পারলাম স্তনের আকারের উপর সম্পূর্ণ প্রভাব থাকে জিন অথবা হরমোনের। এখন আমরা পুরুষ মননে বাসা বাঁধা ভুল ধারণার কারণ অনুসন্ধান করবো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথম প্রেম আমাদের জীবনে আসে কৈশোরে, বয়স যখন ১৪-১৭ এমন সময়ে। এইসময় নারী বলে না, পুরুষের শরীরের গঠনেও খুব দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়। দৈহিক আকার বৃদ্ধি পায়, যৌনাঙ্গ সুগঠিত ও পরিপূর্ণ হয়। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে এই বয়সে আপনার সঙ্গীর শরীরের পরিবর্তন খুবই সুস্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে আপনার চোখে। এতে আপনার সঙ্গ, প্রেম, স্পর্শ কোনোকিছুরই ভূমিকা নেই। আপনি না থাকলেও আপনার সঙ্গীর শরীর এসময় সুগঠিত ও সুন্দর হতো। অনেক সময় নারীর শরীরের পরিবর্তন ১৮-২০ বছর সময়েও সুস্পষ্ট হয় (এটাকে বলে- পিউবার্টি দেরীতে হিট করা। ঠিক যেমন পুরুষের দাঁড়ি গজাতে অনেক সময় দেরী হয়)। বিশোর্ধ অবিবাহিত নারী যারা নিজেদের শরীর মেইনটেইন করে চলেন তাদের যতই প্রেমিক থাকুক না কেনো, শরীরের গঠনে পরিবর্তন মন্থর হয়। তাই “স্পর্শের কারণে হচ্ছে”- এই হাইপোথিসিস পরীক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় বিশোর্ধ অবিবাহিত নারীদের নিয়ে একটা পরিসংখ্যান করে দেখা।
এবার আলোচনা প্রেম থেকে বিয়ের দিকে ধাবিত হলে সেখানে নারীর শরীরে প্রধান পরিবর্তন ঘটে প্রধানত মেদ জমার কারণে। বিয়ের পর আমাদের ঘরের নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে অসচেতন হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত, অনিয়মিত খাদ্য গ্রহণ শরীরে খুব দ্রুত মেদ জমা করে। অনেকে ভাবেন- বিয়ের পর তো নারীরা আরও বেশি পরিশ্রম করে ঘরের কাজে, তাহলে তো এমন স্থুলতা আসার কথা না। এখানেই ভুল। শুধু পরিশ্রম করলেই শরীরের গঠন ঠিক থাকেনা, খাদ্য হিসেবে কী গ্রহণ করছেন এবং কখন গ্রহণ করছেন সেটা মুখ্য ভূমিকা রাখে স্থুলতায়, নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে। সন্তান প্রসবের পরে কেনো স্থুলতা আসে তাতো আলাপ করলামই।
তবে শারীরিক উত্তেজনার সময় রক্তপ্রবাহ বেড়ে স্তন কিছুটা ফুলে উঠতে পারে। পাশাপাশি চুম্বন বা স্পর্শে ব্রেস্ট টিস্যুতে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বেড়ে যেতে পারে, যা সাময়িকভাবে আকারে সামান্য পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু এটি স্থায়ী কোনো বিষয় নয় যে, স্পর্শ করলেই আকার পুরোপুরি পরিবর্তিত হবে। আমাদের আশেপাশের মানুষজন এমনকি আপনিও হয়তো জীবনের কোনো এক সময়ে নারীদের শরীরের এই পরিবর্তন নিয়ে নানা ধরণের বাজে মন্তব্য করে এসেছেন। নিজের অজান্তেই একটা ভুল ধারণা মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছেন এবং ভবিষ্যত প্রজন্মও ভুল বার্তা পেয়ে চলেছে আপনার থেকে, যা কখনোই কাম্য নয়।
একটা শেষ বিষয় আলোচনা করে আজকের পর্ব আমরা শেষ করবো। কখনো কখনো ১০-১১ বছর বয়সী কোনো বালিকার শারীরিক গঠন আমরা গড়পড়তা ১৮-১৯ বছর বয়সী নারীদের মতো সুগঠিত হতে দেখি। আবার কখনো কখনো ১৮-১৯ বছর বয়সী নারীদের শারীরিক গঠন হয় ১০-১১ বছরের বালিকাদের মতো। কেনো? এর প্রধান কারণ টেস্টোস্টেরন আর এস্ট্রোজেন। বয়ঃসন্ধিকালে এস্ট্রোজেনের উচ্চমাত্রার কারণেই প্রধানত স্তনের আকৃতি সমবয়সীদের তুলনায় অধিক বৃহৎ হয়ে থাকে। এস্ট্রোজেনের সাথে সাথে ESR1 জিনেরও একটা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই জিন যার শরীরে যত বেশি সক্রিয় তার স্তনের টিস্যু এস্ট্রোজেনের প্রতি তত বেশি সংবেদনশীল। অর্থাৎ একই পরিমাণ এস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণের পরও দুইজন ভিন্ন নারীর শারীরিক গঠন ভিন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যার স্তনটিস্যু যত বেশি সংবেদনশীল তার স্তন তত বেশি সুগঠিত। স্তনের আকৃতি খর্ব হওয়ার জন্য দায়ী টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব। হরমোনাল ইনসুলিন হরমোনের পরিমাণ শরীরে বেড়ে গেলে এটি ডিম্বাশয় এবং অ্যাড্রেনাল গ্লান্ডকে প্রভাবিত করে এবং অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন উৎপন্ন করে। এই টেস্টোস্টেরন হলো পুরুষ হরমোন যা সমতল বক্ষের জন্য দায়ী, ফলে টেস্টোস্টেরন বেশি যেসব নারীর শরীরে তাদের স্তন খর্বাকৃতির হয়ে থাকে। PCOS আছে এমন নারীর শরীরে হরমোনের ভারসম্যহীনতা ঘটে। যার দরুণ কারো স্তন বয়সের তুলনায় অধিক বৃহৎ বা অধিক খর্ব যেকোনোটাই হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক স্ব-গর্বিত পুরুষ মানুষের কমেন্ট দেখা যায় যেখানে তারা কোনো অল্প বয়সী তরুনীর স্তনের আকার নিয়ে কুরুচিপুর্ণ মতামত দিয়ে থাকেন, কিংবা তাদের চরিত্রে আঙুল তুলে থাকেন। একটু সাধারণ বোধ বুদ্ধি অর্জন করলেই বাঙালি থেকে মানুষ হওয়াটা এতটাও কঠিন নয়!
লেখক: তিকতালিক-Tiktaalik