
গত ১৪ বছরে আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের ধারাবাহিকতা অবিশ্বাস্য…
হ্যাঁ, এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাড়তি সুবিধা ভারত পেয়েছে। এসব আসরে ছোটখাটো ব্যাপারই অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। সেখানে এক ভেন্যুতে খেলা তো অনেক বড় ব্যাপার। তবে পারফরম্যান্সে দাপট-ধারাবাহিকতা দেখিয়েই তারা জিতেছে…
এই আলোচনায় পরে আসছি। ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের খতিয়ান দেখা যাক আগে…
২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পর্যন্ত চারটি আইসিসি আসরে চ্যাম্পিয়ন ভারত- ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং এই আসর…
এই সময়ে চারটি শিরোপা জিতেছে অস্ট্রেলিয়াও- ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৩ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ও ওই বছরের ওয়ানডে বিশ্বকাপ…
তবে ভারত সবাইকে ছাড়িয়ে যোজন যোজন এগিয়ে টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিকতায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ২০১১ বিশ্বকাপ থেকে এই পর্যন্ত রঙিন পোশাকের বৈশ্বিক আসরে ৮৬ ম্যাচের ৭০টিই জিতেছে তারা…
এই সময়ে আর কোনো দল ৫০ ম্যাচও জিততে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ার জয় ৭৭ ম্যাচে ৪৯টি…
২০১১ থেকে এখনও পর্যন্ত দুটি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালসহ মোট ১৩টি আইসিসি টুর্নামেন্ট হয়েছে। ১৩টি আসরেই নকআউট পর্বে খেলেছে ভারত…
নকআউটে যাওয়া ১২ ম্যাচে তারা সেমি-ফাইনালে হেরেছে চারবার, রানার্স আপ হয়েছে পাঁচবার, চ্যাম্পিয়ন চারবার…
তিনটি টুর্নামেন্টে তারা চ্যাম্পিয়ন হলো অপরাজিত থেকে…
শুধু ওয়ানডের কথা যদি বলা হয়, বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এই সময়টায় ৫২ ম্যাচের ৪৪টিতে জিতেছে ভারত। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্বে জিতেছে ৩৮ ম্যাচের ৩৪টি। জয়ের সংখ্যা, জয়-পরাজয়ের অনুপাতে তাদের ধারেকাছে নেই কোনো দল…
লম্বা সময় ধরে পারফর্ম করেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছে তারা…
এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে তারা বাড়তি সুবিধা পেয়েছে। পরিস্থিতির কারণে পেয়েছে। যদিও অন্যান্য দলের বাড়তি ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। আদতে, ভ্রমণ বড় কোনো পার্থক্য গড়ে দেয়নি। লম্বা কোনো ফ্লাইট ছিল না। ভারত মূল সুবিধাটা পেয়েছে পরিকল্পনায়…
যেহেতু সব ম্যাচ তারা দুবাইয়ে খেলবে, উইকেটের খোঁজখবর তারা আগেই নিয়েছে। রোহিত শার্মা বলেছেন, আইএল টি-টোয়েন্টি থেকেই তারা কন্ডিশন ও উইকেট নিয়ে গবেষণা করেছেন। এজন্যই চূড়ান্ত দল থেকে ইয়াসাসভি জয়সওয়ালকে সরিয়ে ভরুন চক্রবর্তিকে নিয়েছেন তারা। রোহিত যুক্তি দেখিয়েছেন, জয়সওয়ালকে নিয়ে গেলে বসিয়েই রাখতে হবে, বড় কোনো চোট-টোটের ঘটনা না হলে। কিন্তু বাড়তি স্পিনার নিয়ে গেলে কাজে লাগার সম্ভাবনা প্রবল…
সেই সিদ্ধান্ত ছিল একটা মাস্টারস্ট্রোক…
অন্য দলগুলি যারা পাকিস্তান-দুবাই, দুই জায়গার খেলার কথা ভাবনায় রেখেছে, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা এত সহজ ছিল না। দু জায়গার উইকেট-কন্ডিশন যে ভিন্ন! স্পিনার বাড়তি নেবেন নাকি পেসার, কিংবা ব্যাটসম্যান, সেই দ্বিধায় তাদের পড়তে হয়েছে…
ভারতকে যদি পাকিস্তানে যেতে হতো, তাহলে নিশ্চিতভাবেই জাসপ্রিত বুমরাহকে তারা মিস করত। দুবাইয়ে সেটা হয়নি, চার স্পিনার পুষিয়ে দিয়েছেন…
তবে এটাও সত্যি, পাকিস্তানে গেলে রানের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার ব্যাটসম্যানও তাদের আছে। বোলারদের কাজ আরও কঠিন হতো, কিন্তু তারাও তো কেউ খারাপ নয়। পাকিস্তানে গেলেও ভারত অন্তত ফাইনালে খেলত বলেই আমার মনে হয়…
মনে রাখা প্রয়োজন, পাকিস্তানে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ক্রিকেটীয় নয়, রাজনৈতিক। আমি সিদ্ধান্তের পক্ষে বলছি না, বাস্তবতা তুলে ধরছি…
সবচেয়ে বড় কথা, গত ১৪ বছরের পরিসংখ্যানই ফুটিয়ে তুলছে, ভারতীয় দল এখন কোন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। আপনি নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দেখাতে পারেন, আইসিসিতে ছড়ি ঘোরানোর কথার কথা বলতে পারেন, স্বেচ্ছাচারিতার কথা বলতে পারেন। তাতে স্রেফ ছিঁচকাঁদুনে হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না…
হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের খবরদারি, সুনিল গাভাস্কারের মতো কিছু সাবেক ক্রিকেটারের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথায় খেলাধুলার ভব্যতা বা শিষ্টাচারের সঙ্গে যায় না। তার মানে এই নয়, তারা এসব করেই বছরের পর বছর ধরে জিতে চলেছে। ২২ গজে লড়াইটা ব্যাট-বলেরই…
ক্রিকেট কাঠামো, সিস্টেম, আইপিএল দিয়ে অর্থ ও ক্রিকেটীয় সম্পদের প্রবাহ, সবকিছু মিলিয়েই প্রচুর প্রতিভা তারা তুলে আনছে এবং প্রতিভাগুলোকে প্রস্ফূটিত হওয়ার সেরা পরিবেশ গড়ে দিচ্ছে। তাদের জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা, ‘এ’ দলে কার্যক্রম, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের কাঠামো, দেশজুড়ে ক্রিকেটীয় ইকোসিস্টেম, সবকিছু মিলিয়েই তারা শ্রেষ্ঠত্বের পথ ধরে ছুটে চলেছে…
স্রেফ হাহুতাশ করলে পেছনেই পড়ে থাকতে হবে, একসময় তারা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাবে। তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হলে ক্রিকেটীয় পথেই এগোতে হবে…
তাদের মতো করেই সব করা জরুরি নয়। নিজেদের মতো করলেও সম্ভব, যদি সেখানে ‘সত্যিকারের ক্রিকেট’ থাকে…
~ আরিফুল ইসলাম রনি